আপনার বিরুদ্ধে মামলা হলে করণীয়: আইনি পরামর্শ ও প্রতিকার



সূচনা

আপনার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা সত্য নাকি মিথ্যা তা প্রমাণ হতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। আপনি যদি মিথ্যা মামলায় ফেঁসে যান, তাহলে কী করবেন? কোথায় যাবেন? কীভাবে প্রতিকার পাবেন? এ সম্পর্কে যথাযথ ধারণা না থাকার ফলে আপনার ভোগান্তি কয়েকগুণ বেড়ে যেতে পারে। অকারণেই কোনও ফৌজদারি মামলার আসামি হলে অথবা আসামি হয়ে গ্রেফতার হলে ওই বিচারপ্রার্থীকে এবং তার স্বজনদের কীভাবে ঘাটে ঘাটে ভোগান্তি পোহাতে হয় তা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ জানে না। এই ভোগান্তি থেকে মুক্তি পেতে দেওয়া হলো এসম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা। 

what-to-do-if-you-are-sued-legal-advice-and-remedies-in-bangla


ফৌজদারি মামলা

ফৌজদারি মামলায় জড়িয়ে পড়লে আপনার সম্মান, সম্পত্তি ও সামাজিক মর্যাদা হুমকির মুখে পড়তে পারে। আপনি যখন নিশ্চিত হবেন, আপনার বিরুদ্ধে কোনও ব্যক্তি পূর্বশত্রুতার জেরে অথবা অন্য কোনও কারণে ফৌজদারি মামলা দায়ের করেছে, তখন দ্রুত ফৌজদারি মামলায় অভিজ্ঞ কোনও আইনজীবীর শরণাপন্ন হোন।ফৌজদারি মামলায় 'জামিন' একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। 

ফৌজদারি মামলা সংক্রান্ত ব্যাপারে দেওয়ানি মামলায় অভিজ্ঞ আইনজীবীর দ্বারস্থ হবেন না। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, দণ্ডবিধি, ফৌজদারি কার্যবিধিসহ প্রচলিত অন্যান্য আইনে মামলা হলে আদালত থেকে আপনাকে অবশ্যই জামিন নিতে হবে। 

মনে রাখবেন, ফৌজদারি মামলায় আসামি হওয়া মানেই আপনি অপরাধী নন। আপনি জামিনে মুক্তি পেয়ে আদালতে সাক্ষ্য প্রমাণ দিয়ে প্রমাণ করতে পারেন, আপনি নির্দোষ। অনেকে ফৌজদারি মামলা থেকে বাঁচার উপায় হিসেবে গা ঢাকা দেয় অর্থাৎ আত্মগোপনে থাকতে চায়। এটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। 

দেওয়ানি ও পারিবারিক মামলায় করণীয়

দেওয়ানি মামলা সাধারণত জমি, সম্পত্তি ও পারিবারিক বিরোধ সম্পর্কিত হয়ে থাকে । আমাদের দেশে বিচারাধীন মামলার সিংহভাগ মামলা দেওয়ানি প্রকৃতির। আপনার কষ্টার্জিত অর্থে ক্রয়কৃত জমি অথবা পৈতৃক সূত্রে (ওয়ারিশ হিসেবে) প্রাপ্ত জমি বেদখল হলে কিংবা জমিজমা সংক্রান্ত কোনও বিরোধ (বিতর্ক) দেখা দিলে তৎক্ষণাৎ দেওয়ানি মামলায় অভিজ্ঞ একজন আইনজীবীর শরণাপন্ন হোন। আপনার প্রতিবেশী কোনও প্রভাবশালী ব্যক্তি আপনার দখলি জমি থেকে আপনাকে বেদখল করলে এবং ওই জমিতে ওই প্রভাবশালী মহল স্বল্প সময়ের মধ্যে বাণিজ্যিক ভবন কিংবা অন্য কোনও স্থাপনা তৈরি করে জমির আকার-আকৃতি পরিবর্তন করতে প্রচেষ্টা চালালে আপনাকে অবশ্যই দেওয়ানি মামলায় অভিজ্ঞ এবং প্রবীণ কোনও আইনজীবীর দ্বারস্থ হতে হবে। যে জমিতে কৃষিকাজ করে আপনি সংসার নির্বাহ করেন। অথবা যে জমির ওপর বসতঘর নির্মাণ করে আপনি পরিবার-পরিজনসহ বসবাস করেন সেই জমি নিয়ে বিরোধ দেখা দেওয়া মাত্রই আইনজীবীর চেম্বারে যান নতুবা বিলম্ব করার কারণে আপনি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন যা পরবর্তীকালে অর্থ কিংবা অন্য কোনও কিছু দিয়ে পূরণ করা যাবে না।

বিশেষ আদালতের মামলা ও করণীয়

বাংলাদেশে প্রচলিত আইনি ব্যবস্থায় বিশেষ জজ আদালতসহ সরকারের বিভিন্ন সেবা প্রতিষ্ঠান ও দফতরে তথা কিছু নির্দিষ্ট অপরাধের জন্য বিশেষ বিশেষ আদালত রয়েছে যেমন :

  • বিদ্যুৎ সংক্রান্ত বিরোধ নিস্পত্তির জন্য বিদ্যুৎ আদালত, 
  • সিটি করপোরেশন সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য প্রত্যেক সিটি করপোরেশনে স্থাপিত আদালত, 
  • ট্যাক্স আপিল ট্রাইব্যুনাল পরিবেশ আদালত, 
  • অর্থঋণ আদালত, 
  • দেউলিয়া বিষয়ক আদালত, 
  • ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল ইত্যাদি। 
  • নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল
  • সাইবার ট্রাইব্যুনাল
  • মানব পাচার প্রতিরোধ ট্রাইব্যুনাল
  • দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংক্রান্ত বিশেষ আদালত

এ শ্রেণীর আদালতগুলোতে স্ব স্ব বিভাগের বিশেষ বিশেষ আইন প্রয়োগ হয়। এছাড়াও জমিজমার ব্যাপারে স্থানীয় সহকারী কমিশনার (ভূমি) সার্কেল অফিসে, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) অতঃপর অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) কার্যালয়ে নামজারি সংক্রান্ত মিস কেইস নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করতে হতে পারে। যদি আপনার বিরুদ্ধে এই আদালতগুলোর অধীনে মামলা হয়, তবে দ্রুত সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর পরামর্শ নিন এবং যথাযথ আইনি প্রতিকার গ্রহণ করুন।


মামলা হওয়ার পর করণীয়

আপনার বিরুদ্ধে কোন মিথ্যা কিংবা সত্যি মামলা মোকদ্দমা দায়ের হওয়ার সংবাদ প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই আইনজীবীর পরামর্শ গ্রহণ করুন। অনেকে খামখেয়ালিবশত মামলা-মোকদ্দমার সংবাদ পাওয়া স্বত্তেও দ্রুত কার্যকরী উদ্যোগ না নেয়ার কারণে পরবর্তীকালে চরমভাবে দূর্ভোগ পোহাতে হয়। আপনি একজন বিশ্বস্ত দায়িত্ববান ও চৌকষ আইনজীবীর শরণাপন্ন হলে নিশ্চই আপনার অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন। 

ঘাবড়াবেন না, সামলে নিন

মামলা-মোকদ্দমার কথা শুনলে অনেকে ঘাবড়ে যান, অনেকে আবার দারুণভাবে ভেঙে পড়েন। মামলার কথা শুনে আঁতকে না উঠে বরং বুদ্ধিবিবেচনা কাজে লাগিয়ে ধিরস্থিরভাবে সামলে নিন। আপনার বিরুদ্ধে কোনও মামলা মোকদ্দমা দায়ের হলেই আপনি দোষী বা অপরাধী ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত হবেন না। যে কোনও ব্যক্তি পূর্বশত্রুতার জের ধরে যে কোনও ব্যক্তিকে হয়রানি করতে মামলা-মোকদ্দমা দায়ের করতে পারেন। আপনি স্থিরভাবে এবং ধৈর্য সহকারে আপনার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ খণ্ডনের জন্য ত্বড়িত ব্যবস্থা নিন।

সর্বশেষ পরামর্শ

আপনি একজন সচেতন মানুষ হিসেবে ন্যায়বিচার অবশ্যই প্রত্যাশা করেন। সেজন্য আপনাকে আদালতে আইনি লড়াই করতে হবে। তবে একথা সত্যি, আপনি একটা মিথ্যা মামলার আসামি হয়ে ওই মিথ্যা। মামলা প্রমাণ করতে দীর্ঘ সময় কোর্ট-কাচারির খরচ আর উকিল সাহেবের। ফি দিতে দিতে দেউলিয়া হয়ে যেতে পারেন। একই সংগে একথাও সত্যি, আপনার টাকা-পয়সা এবং সামাজিক প্রভাব প্রতিপত্তি না থাকলে ন্যায়বিচার পাওয়া এত সহজ ব্যাপার নয়। মান্ধাতা আমলের আইনি ব্যবস্থায় আপনি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চাইলে ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে থানা পুলিশ, কোর্ট পুলিশ, পাবলিক প্রসিকিউটরসহ (পিপি) আরও অনেককে নগদ নারায়ণ দিয়ে সন্তুষ্ট করতে হবে, নচেত মিথ্যা মামলায় ফেঁসে গিয়েও সুবিচার প্রত্যাশা করা বোকামি হবে। দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রেও 'ম্যানেজ' প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। 


 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ